রবিবার (৭ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ সাক্ষ্য দেন আনাসের মা। এ নিয়ে মামলায় মোট ১১ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হলো। পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য হয়েছে আগামী ১১ সেপ্টেম্বর।
মামলার পক্ষে প্রধান প্রসিকিউটর মো. তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিমসহ রাষ্ট্রপক্ষের অন্যান্য আইনজীবীরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
সন্তানের শেষ চিঠি
আনাসের মা আদালতে বলেন, “আমার ছেলে আনাস গেন্ডারিয়া আদর্শ একাডেমির দশম শ্রেণির ছাত্র ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকালে বাসায় তাকে খুঁজে পাইনি। ওর পড়ার টেবিলে একটি চিঠি পাই। চিঠিতে লিখেছিল, ‘আমার ভাইয়েরা রাস্তায় জান কুরবান করছে, আমি বসে থাকতে পারলাম না। মৃত্যুর ভয় পেয়ে ঘরে বসে থাকা স্বার্থপর মানুষের কাজ। যদি ফিরতে না পারি, কষ্ট পেও না, গর্ব করো।’”
চিঠির কথা বলতে বলতে তিনি আদালতে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
মৃত্যুর মুহূর্ত
তিনি আরও জানান, ওইদিন দুপুর ১টা ২০ মিনিটে অজ্ঞাত একটি নম্বর থেকে ফোন আসে। অপরপ্রান্ত থেকে জানানো হয়, “আপনার ছেলে আন্দোলনে গিয়েছিল? দ্রুত স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান।” সেখানে গিয়ে তিনি রক্তমাখা স্ট্রেচারে ছেলেকে দেখতে পান।
“আমি আনাসকে জড়িয়ে ধরি। তখন সজীব নামে এক ছেলে জানায়, পুলিশের গুলিতে চাঁনখারপুলে আনাস নিহত হয়। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে ডেথ সার্টিফিকেট পাই, যেখানে মৃত্যুর কারণ লেখা ছিল—গানশট।”
হত্যার বিবরণ
সাঞ্জিদা বলেন, “চোখের সামনে ছাত্রদের ওপর পুলিশ গুলি চালিয়েছে। সজীব ও অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছে, হাজারো শিক্ষার্থীকে সেদিন চাঁনখারপুলে আটকে দেয় পুলিশ। প্রথমে সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট, পরে সরাসরি গুলি চালানো হয়। গুলিতে আনাসের বুকে লাগে এবং সে সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।”
তিনি আরও জানান, ভিডিও ফুটেজ, আনাসের হাতে লেখা চিঠি, রক্তমাখা কাপড়, মৃত্যুসনদ ও হাসপাতালের টিকিট ইতোমধ্যে আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।
অভিযুক্তদের নাম
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, “আমি প্রত্যক্ষদর্শী ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জেনেছি, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের নির্দেশে সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, আকতারুল ইসলাম, এসি ইমরুল ও ওসি আরশাদের উপস্থিতিতে কনস্টেবল সুজন, ইমাজ ও নাসিরুল শিক্ষার্থীদের উপর নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে আনাসসহ ছয়জন শহীদ হন।”
তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন—“এই হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত নির্দেশদাতা ছিলেন শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল, ওবায়দুল কাদের ও সাবেক আইজিপি আবদুল্লাহ আল মামুন। আমি তাদের ফাঁসি চাই।”
মামলার অগ্রগতি
গত ১৪ জুলাই আইসিটি-১ মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে। আট আসামির মধ্যে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, অতিরিক্ত উপকমিশনার আকতারুল ইসলাম ও সহকারী কমিশনার ইমরুল বর্তমানে পলাতক। বাকিদের মধ্যে চারজন—সাবেক ওসি আরশাদ, কনস্টেবল সুজন, ইমাজ ও নাসিরুল—কারাগারে রয়েছেন এবং এদিন আদালতে হাজির করা হয়।
পারিবারিক শোক ও জনআবেগ
সাঞ্জিদা খান দীপ্তি সাক্ষ্যে বলেন, “আমরা আনাসকে রক্তমাখা কাপড়ে কোলে নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম। পরে এলাকাবাসী লাশ নিয়ে মিছিল বের করে। সবার কণ্ঠে তখন একটি প্রশ্ন—‘আমার ভাই কেন মরলো? জবাব দাও হাসিনা।’”
সেদিন আসরের নামাজের পর ধূপখোলা মাঠে আনাসের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।