স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্ট বা অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন এতদিন পর্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি চিকিৎসা হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কারণ রোগীর শরীরকে প্রতিস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করতে হলে আগে কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশন ব্যবহার করে পুরনো স্টেম সেল ধ্বংস করতে হতো। এতে রোগীর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়ত, দেখা দিত দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা, এমনকি গড়ে উঠত সেকেন্ডারি ক্যান্সারের ঝুঁকিও।
কিন্তু এবার এক যুগান্তকারী অগ্রগতি ঘটেছে। স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের গবেষকরা এমন একটি অ্যান্টিবডি-ভিত্তিক পদ্ধতি তৈরি করেছেন, যা কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশন ছাড়াই স্টেম সেল প্রতিস্থাপনকে সম্ভব করছে।
কীভাবে কাজ করে নতুন প্রযুক্তি?
এই নতুন প্রোটোকলে রোগীকে দেওয়া হয় ব্রিকুইলিম্যাব (briquilimab) নামের একটি অ্যান্টিবডি। এটি শরীরে CD117 নামের এক বিশেষ প্রোটিনকে টার্গেট করে, যা রক্ত তৈরির স্টেম সেলের উপর থাকে। এই অ্যান্টিবডি পুরনো স্টেম সেলগুলোকে সরিয়ে দেয়, ফলে শরীর নতুন দাতা স্টেম সেল গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হয়—কোনো রেডিয়েশন বা টক্সিক কেমোথেরাপি ছাড়াই।
প্রথম ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফল
এই পদ্ধতিটি প্রথমে পরীক্ষা করা হয়েছে তিনজন শিশুর ওপর, যারা বিরল এক জেনেটিক রোগে ভুগছিল—ফ্যানকোনি অ্যানিমিয়া।
ফ্যানকোনি অ্যানিমিয়া রোগীদের DNA মেরামতের ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত থাকে, ফলে প্রচলিত কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশন তাদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে।
তিনজন শিশুকে শুধুমাত্র ব্রিকুইলিম্যাবের একবার ইনফিউশন দেওয়া হয়।
দুই বছর পর দেখা যায়, তাদের প্রায় ১০০% রক্তকণিকা দাতা স্টেম সেল থেকে তৈরি হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় কথা, কোনো গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।
গবেষকরা জানিয়েছেন, এই ফলাফল প্রত্যাশার চেয়েও অনেক ভালো এবং এটি ভবিষ্যতের স্টেম সেল থেরাপির জন্য এক আশার আলো।
কেন এটি যুগান্তকারী?
- প্রচলিত ঝুঁকি নেই: রেডিয়েশন ও কেমোথেরাপি ব্যবহারের ফলে সেকেন্ডারি ক্যান্সার, অঙ্গ ক্ষতি ও সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। এই নতুন পদ্ধতিতে সেসব ঝুঁকি নেই।
- বেশি রোগীর জন্য উপযোগী: শুধু ফ্যানকোনি অ্যানিমিয়া নয়, অন্যান্য জেনেটিক রোগ যেমন ডায়মন্ড-ব্ল্যাকফ্যান অ্যানিমিয়া বা এমনকি বয়স্ক ও দুর্বল ক্যানসার রোগীদের জন্যও এটি কার্যকর হতে পারে।
- ডোনারের সুযোগ বাড়বে: নিরাপদ পদ্ধতি হওয়ায় দাতা স্টেম সেল প্রতিস্থাপন আরও সহজ হবে।
- জীবনমান উন্নত হবে: রোগীরা দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা ছাড়াই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবেন।
বিশেষজ্ঞ মতামত
গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে Nature Medicine জার্নালে (২২ জুলাই, ২০২৫)। প্রধান গবেষক ড. রমেশ আগরওয়াল বলেন—
> “আমরা আশা করেছিলাম শিশুদের শরীরে অন্তত ১০% দাতা স্টেম সেল কাজ শুরু করবে। কিন্তু দুই বছর পর দেখা গেল তাদের প্রায় সব রক্তকণিকাই দাতার। এটি একেবারেই যুগান্তকারী সাফল্য।”
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা
ইতিমধ্যে গবেষণাটি ফেজ-২ ট্রায়ালে প্রবেশ করেছে।
পরবর্তী ধাপে আরও বেশি রোগীর ওপর পরীক্ষা চালানো হবে।
সফল হলে এই প্রোটোকলকে “নতুন স্ট্যান্ডার্ড” হিসেবে ব্যবহার শুরু হতে পারে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই।
স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্ট এতদিন ছিল ভয়ঙ্কর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ভরা চিকিৎসা। কিন্তু ব্রিকুইলিম্যাব অ্যান্টিবডি ব্যবহার করে নতুন এই প্রযুক্তি সবকিছু বদলে দিতে চলেছে। এটি শুধু বিরল জেনেটিক রোগ নয়, ভবিষ্যতে ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
যদি পরবর্তী ট্রায়ালগুলোও একইভাবে সফল হয়, তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি হবে একটি বিপ্লবী অধ্যায়, যেখানে রোগীরা আর ভয়ঙ্কর রেডিয়েশন বা কেমোথেরাপির ঝুঁকি ছাড়াই নতুন জীবন ফিরে পাবেন।